জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা, নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি সংস্কার এবং বৈশ্বিক আস্থা পুনর্গঠনের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। চলতি অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’।
ড. খলিলুর রহমান নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত বৈষম্য তুলে ধরে বলেন, জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক সদস্যগোষ্ঠী এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও আফ্রিকা নিরাপত্তা পরিষদে কোনো স্থায়ী আসন পায়নি। তাই আফ্রিকাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে যথাযথভাবে স্থান দিতে হবে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বের দাবি কোনো করুণা নয়; এটি ন্যায়বিচার এবং জাতিসংঘের নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন।
তিনি নিরাপত্তা পরিষদকে আরও স্বচ্ছ, প্রতিনিধিত্বশীল এবং বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর গুরুত্ব দেন। এ ক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদের আন্তঃসরকারি আলোচনা প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন জানান তিনি।
জাতিসংঘের প্রতি বৈশ্বিক আস্থা পুনরুদ্ধারে তিনটি প্রধান কৌশলের ওপর জোর দেন খলিলুর রহমান—নিজেদের ব্যর্থতা সম্পর্কে স্পষ্টবাদী ও বাস্তববাদী হওয়া, সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুশীল সমাজ ও বিজ্ঞানীদের ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা।
বিশ্বব্যাপী বৈষম্য ও সামরিক খাতের ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি জানান, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি যখন থমকে আছে, ঠিক তখনই ‘ওইসিডি’ দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা এক বছরে ২৩ শতাংশ কমে ১৭৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এর বিপরীতে বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
গাজা, সুদান, ইউক্রেন, মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার নীতি কখনোই নির্বাচনী বা পক্ষপাতমূলকভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। পাশাপাশি বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির ও হাইতিতে জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রমের ইতিবাচক ভূমিকার উদাহরণও তিনি তুলে ধরেন।
প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে সাধারণ পরিষদের সভাপতি বলেন, জল সরবরাহ, বিদ্যুৎ ও সামরিক খাতের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এআইয়ের অপব্যবহার মানব সভ্যতার অস্তিত্বের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এআই অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকাতে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের সাথে নিয়ে দ্রুত প্রমাণভিত্তিক বৈশ্বিক নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো (‘গার্ডরেল’) তৈরির তাগিদ দেন তিনি।

